ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
বন্যা পরিস্থিতি * শুকনো খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকট * বন্যাকবলিত এলাকায় সাপ আতঙ্ক * বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে * অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের

ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন

  • আপলোড সময় : ২৬-০৮-২০২৪ ০১:০৬:২৭ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৬-০৮-২০২৪ ০১:০৬:২৭ পূর্বাহ্ন
ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন ফেনীতে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি। বন্যায় পুরো ফেনী শহর জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে বন্যার্ত মানুষ। ছবিটি রোববার ফেনী শহরের হাসপাতাল মোড় থেকে তোলা
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাত গত মঙ্গলবার থেকে দেশের ৮টি জেলায় ভয়াবহ বন্যায় রূপ নেয়। এসময় ১১টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। ভয়াবহ সংকটে এখনও পানিবন্দি এসব দুর্গত এলাকার মানুষ। ওইসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ লাখের অধিক মানুষ। গতকাল রোববার থেকে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। পানির স্রোতে ভেঙে গেছে বিভিন্ন গ্রামে রাস্তা ও সড়ক। অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে। তলিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সড়ক থেকে পানি সরে যাওয়ায় ভেসে উঠছে ক্ষতের চিহ্ন। বন্যার পানি যত কমছে, ততোই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। ডুবে যাওয়া পুকুর থেকে মাছ ভেসে গেছে। সবজি খেত ও ফসলি জমির রোপা আমন নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু বাড়িঘরেও পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অনেক মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও বেশ কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এরইমধ্যে লক্ষ্মীপুরে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গত মঙ্গলবার রাতের বৃষ্টিতে পানি বেড়ে গিয়ে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দদের। শুকনো খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকট ভোগান্তিতে যোগ করছে নতুন মাত্রা।
জানা গেছে, সোনাগাজী ও দাগনভূঞা ছাড়া ফেনীতে সামগ্রিকভাবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফুলগাজী-পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া থেকে পানি কিছুটা নেমেছে। তবে নতুন করে আরও কয়েকটি ইউনিয়ন নিমজ্জিত হচ্ছে বলেও জানা গেছে। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, সোনাগাজী ও দাগনভূঞার অবস্থা ভয়াবহ। এই মুহূর্তে ফেনী সদর, ফুলগাজী ও সোনাগাজীর মানুষের ত্রাণের বেশি প্রয়োজন। তবে বহু এলাকা থেকে জোর করে ত্রাণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তিন দিন আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ের বুড়বুড়িয়া এলাকায় গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে থাকে। গত শুক্রবার থেকে নতুন করে অনেক গ্রাম প্লাবিত হতে থাকে। ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, বুড়িরচংসহ ১৪ উপজেলার ১১৮টি ইউনিয়ন তলিয়েছে বানের জলে। পানিবন্দি প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে পানি, নৌকা ও খাবার পানির সংকট বাড়ছে বলে জানা গেছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে হবিগঞ্জে। ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করায় ঘরে ফিরতে শুরু করেছে বানভাসীরা। তবে চারদিকেই বন্যার ক্ষত। সড়ক থেকে শুরু করে গৃহস্থের ঘর, কিছুই আর অক্ষত নেই। পানি কমেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও। তবে এখনও জলমগ্ন কসবাসহ নিম্নাঞ্চল। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা নিয়ে পাশে আছে স্বেচ্ছাসেবীরা। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এছাড়া, মৌলভীবাজারেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে চোখ রাঙাচ্ছে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি। রাত থেকে কয়েক দফায় বৃষ্টি হয়েছে খুলনা নগরীতে। ভারী থেকে মাঝারি বর্ষণে তলিয়ে গেছে নগরীর পথঘাট। বাসাবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে পড়েছে পানি। সড়ক জলমগ্ন থাকায় বিড়ম্বনায় পড়ে কর্মজীবী মানুষ। খাগড়াছড়িতে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে পানি। স্পষ্ট হতে শুরু করেছে ক্ষতচিহ্ন। প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে থাকায় ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। তবে পানি নামার ৩ দিনেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি সদরসহ দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা উপজেলার শতাধিক পরিবার। অনেকের ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে, ক্ষতি হয়েছে বাড়ির আঙ্গিনা ও আশপাশের শাক-সবজির ক্ষেত। গতকাল রোববার সকালে খুলে দেয়া হয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি গেট। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ের ১৬টি গেইট দিয়ে ৬ ইঞ্চি করে পানি ছাড়া শুরু হয়েছে। প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভয়াবহ বন্যায় দেশের ৭ জেলায় ১৮ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫২ লাখ ৯ হাজার মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার আখাউড়ায় বন্যা দেখা দেয়। এতে উপজেলার বঙ্গেরচর, কালিকাপুর, আব্দুল্লাপুর, বাউতলা, সাহেবনগর, অমরপুর, আইড়ল ও খলাপাড়াসহ ৪০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার বন্যার পানি বেড়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পানির বেগ কমায় এবং বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কমতে থাকে। শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়। ফলে বেশিরভাগ বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়। তবে কয়েকটি বাড়িঘরে কেউ কেউ পানিবন্দি আছেন। আড়িয়ল ইউনিয়ন ও খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর দুটি বাঁধসহ অন্তত আট স্থানে সড়ক ধসে পড়েছে। এতে করে এসব সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ আছে। এসব এলাকার পানি ধীরগতিতে নামছে। তবে পানি নেমে গেলেও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এখনও বন্ধ রয়েছে আখাউড়া স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। পাশাপাশি আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়েও যাত্রী পারাপার বন্ধ আছে। পানির স্রোতে আখাউড়া-আগরতলা সড়কের আব্দুল্লাহপুর, বঙ্গেরচর এলাকায় পিচ উঠে গেছে।
হবিগঞ্জে জেলায় কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। ইতোমধ্যে অনেক বাসা-বাড়ি ও সড়ক থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদ-নদীর পানি। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় অনেক লোকজন তাদের বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় ভেসে উঠছে সড়ক, বাড়িঘরসহ নানা স্থাপনার ক্ষত চিহ্ন।  হবিগঞ্জ জেলায় বড় ধরনের বন্যার আগ্রাসন না হলেও যেসব নিন্মাঞ্চলে পানি উঠেছে সেইসব অঞ্চল থেকে পানি নেমে যাওয়ায় সড়কে দেখা দিয়েছে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে গর্তের। এছাড়াও বাড়িঘরের সামনে লেগে আছে কাঁদাসহ ময়লা আবর্জনা।
সবশেষে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ পর্যন্ত ৬টি উপজেলার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বন্যায় আক্রান্ত হওয়া উপজেলাগুলো হলো-চুনারুঘাট উপজেলা, মাধবপুর উপজেলা, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা, হবিগঞ্জ সদর, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা। এসব উপজেলায় মোট ৩০টি ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৬৮৫টি পরিবার বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। আর এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭০ হাজার ২৪০ জন মানুষ। দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুমি রানি বল। তিনি জানান, বর্তমানে বন্যা দুর্গতের জন্য চালু রয়েছে ৮টি কেন্দ্র। আশ্রয় কেন্দ্রেগুলোর মধ্যে ৪৫৮ জন পুরুষ, ৪৬৭ জন মহিলা, ১১৮ জন শিশু ও ২ জন প্রতিবন্দী আশ্রয় নিয়েছেন। শহরতলীর নোয়াগাও এলাকায় বাড়ি ঘরে চলে যাওয়া লোকজনের সাথে আলাপ হলে তারা জানান, আমাদের বাড়ি ঘর থেকে পানি নেমে গেলেও এখনই আমরা বাড়িতে বসবাস শুরু করতে পারছি না। যে কারণে আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছি। তবে বাড়ি ঘর পরিস্কারের জন্য আমরা এসেছি। পুরো ঘর বাড়ি কাঁদা ও ময়লা আবর্জনায় ভরে গেছে। তা পরিস্কার করতে হবে। তারা বলেন, বাড়িতে যেসব মালামাল রয়ে গেছিল তা সেইসব মালামাল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ডাকাতিয়া, মেঘনার তীরবর্তী ও বেড়িবাঁধ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মেঘনার জোয়ার ও ভারি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই বন্যার পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। স্রোতে ভেঙে গেছে বিভিন্ন গ্রামে রাস্তা ও সড়ক। অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে। কিছু বাড়িঘরেও পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অনেক মানুষের। গত শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) শাহেদ আরমানের নেতৃত্বে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা, সচেতন নাগরিক, পুলিশ, রেডক্রিসেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যক্তিরা ডাকাতিয়া নদী সংযোগ খালে অবৈধ বাঁধগুলো কেঁটে দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে বন্যা দেখা দেওয়ায় পৌরসভার পশ্চিম কাঞ্চনপুর, দেনায়েতপুরসহ নয়টি ওয়ার্ড, উপজেলার পুর্বাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নের কেরোয়া, বামনী, সোনাপুর, চরপাতা এবং মেঘনা উপকূলীয় ৪টি ইউনিয়নসহ ১০০ টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। বুধবার ও বৃহস্পতিবার বন্যার পানি বেড়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে জোয়ারের পানির বেগ কমায় এবং থেমে থেমে বৃষ্টি কম হওয়ায় পানি কমতে থাকে। শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়। ফলে বেশিরভাগ বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়। তবে কয়েকটি বাড়িঘরে কেউ কেউ পানিবন্দি আছেন। উত্তর ও দক্ষিন চরবংশী এবং উত্তর ও দক্ষিণ চরআবাবিল ইউপির সংলগ্ন মেঘনা নদীর কয়েকটি স্থানসহ পৌরসভার বেশিরভাগ সড়ক ধসে পড়েছে। এতে করে এসব সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ আছে। এলাকার পানি ধীরগতিতে নামছে।। পানির স্রোতে সড়কের শহরের টিএন্ডটি  এবং রুস্তম আলী কলেজ এলাকায় পিচউঠে গেছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের পানি নেমে গেছে। উপজেলার মূল সড়কসহ ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার অভ্যন্তরীণ অন্তত ২০টি সড়ক অচল হয়ে গেছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। বন্যায় রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ডুবে যাওয়া পুকুর থেকে মাছ ভেসে গেছে। সবজি খেত ও ফসলি জমির রোপা আমন নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলার কয়েকটি জায়গায় পানি নেমে গেলেও শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত গুমাই বিলসহ অন্তত ১৫টি বিলের রোপা আমন ধানখেত পানির নিচে। আরও কয়েক দিন পানি থাকলে আমন চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল কান্তি চাকমা বলেন, প্রাথমিকভাবে কয়েকটি ইউনিয়নের ৪০টি কাঁচা বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ৭০ পরিবারকে দুই টন চাল, শুকনো খাবার ও খাবার স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। পুরো উপজেলা ও পৌর এলাকার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করতে একটু সময় লাগবে। ফটিকছড়িতে হালদা নদী, ধুরুং খাল এবং সর্তা খালের পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে। পানি কমতে শুরু করায় ভেসে উঠছে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। বিশেষত বন্যার পানিতে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে মাটি, টিনের বাড়িঘর এবং মহাসড়ক ও গ্রামীন সড়ক ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। উজান থেকে নামা হালদা নদীর ঢলে পূর্ব সুয়াবিলে দেখা দিয়েছে বাড়িঘর দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া ভাঙনের চিত্র। এমন অসংখ্য বাড়িঘর ভেঙে গেছে এ এলাকায়। একইসাথে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক, ফটিকছড়ি-বারৈয়ারঢালা সড়কে দেখা যাচ্ছে ভাঙন। পানি নামার পর সড়কের ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠেছে। ফটিকছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় এ উপজেলায় নদী ও খাল গুলোর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পানি কমতে থাকলেও এখনো সুয়াবিলের বিভিন্ন জায়গায় পানি এখনো কমেনি।
তবে বন্যায় লক্ষ্মীপুরে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা। গত শনিবার রাতের বৃষ্টিতে পানি বেড়ে গিয়ে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জেলার বাসিন্দদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর সদর, রামগতি, কমলনগর, রামগঞ্জ, রায়পুরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। গত শনিবার জেলা মপ্রশাসন জানিয়েছে, লক্ষ্মীপুর জেলায় ৬ লাখ ৫৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এ জন্য ৩৯৫ মেট্টিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৮৯টি সাইক্লোন শেল্টারে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, বার এন্ড এসোসিয়েটস সার্বিক সহযোগীতায় গত বুধবার থেকে বৈষ্যমবিরোধী ছাত্র সমাজের যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, ডেমরা থানাধীন সমন্বয়ক এবং সহ-সমন্বয়কদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ফেনী, নোয়াখালি এবং লক্ষীপুর এলাকার বনবাসীদের ত্রান বিতরন এবং উদ্ধার কাজ করছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর  সাথে যৌথভাবে ত্রান বিতরন এবং উদ্ধার কাজ এখনও চলছে। ওয়াকিটকি নিয়ে দ্রুত সেবার জন্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বার এন্ড এসোসিয়েটস এর কর্নধার জনাব বখতিয়ার আহমেদ রনী। ছাত্র সমাজের সমন্বয়ক আশিকুজ্জামানসহ তার সকল সহ-সমন্বয়ক। তাছাড়া উক্ত কাজে আর্থিক সহযোগিতা করছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা। বখতিয়ার আহমেদ রনী বলেন, আমরা অন্তবর্তকালীন সরকারের সহযোগীতা পেলে যে কোনো কাজ বৈধভাবে সুশৃংখলভাবে ৩ কর্মদিবসের মধ্যে শেষ করতে পারবো। যা টাকা লাগবে তা আমরাই ব্যবস্থা করে নিব । আমরা সরকারকে চিঠি দিয়েছি, এখন সরকারের সহযোগিতার জন্য অপেক্ষায় আছি।
অপরদিকে ফেনীর উজানের পানিতে নোয়াখালীর বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় আছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট। একদিকে খাদ্যসংকট, অন্যদিকে সাপের উপদ্রব; দুইয়ে মিলে নাকাল বন্যাদুর্গতরা। নির্ঘুম রাত কাটছে অনেকের। গতকাল রোববার দুপুরের দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আব্দুল আজিম বলেন, গত তিন দিনে নোয়াখালীতে ৬৩ জনকে সাপে কেটেছে। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাপে কেটেছে ২৮ জনকে। বন্যার কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১০৮ জন। নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া অধিদফতরের উচ্চ পর্যবেক্ষক আরজুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের পানিতে বন্যার পানি বাড়ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান বলেন, বন্যায় নতুন করে কোনো এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। গতকাল রোববার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। সচিব বলেন, সার্বিকভাবে ১১ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। নতুন করে কোনো এলাকা প্লাবিত হচ্ছে না এবং হওয়ার আশঙ্কা নেই। মো. কামরুল হাসান আরও বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ৩৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ৩৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরকারি-বেসরকারিসহ সব পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে বলেও জানান তিনি।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স